Thursday, Jan 15, 2026 28°C

Concise and comprehensive global coverage.

General

তরুণ ভোটাররা নির্ধারণ করবে আগামী নির্বাচনের ফল

ছোটবেলা থেকেই তারা শুনে এসেছেন—ভোট দেওয়া তাদের অধিকার। কিন্তু গত তিন নির্বাচনে তারা দেখেছেন এই অধিকার কীভাবে খর্ব হয়। তবে এবারের পরিস্থিতি বিগত তিনটি নির্বাচনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গণ–অভ্যুত্থান, সংস্কার এবং ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ ভোটাররা।দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই এখন তরুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে এই তরুণ ভোটাররাই হয়ে উঠতে পারেন নির্ণায়ক শক্তি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শেষ বর্ষের...

NP
Published: January 11, 2026, 09:28 PM
তরুণ ভোটাররা নির্ধারণ করবে আগামী নির্বাচনের ফল

ছোটবেলা থেকেই তারা শুনে এসেছেন—ভোট দেওয়া তাদের অধিকার। কিন্তু গত তিন নির্বাচনে তারা দেখেছেন এই অধিকার কীভাবে খর্ব হয়। তবে এবারের পরিস্থিতি বিগত তিনটি নির্বাচনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গণ–অভ্যুত্থান, সংস্কার এবং ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ ভোটাররা।

দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই এখন তরুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে এই তরুণ ভোটাররাই হয়ে উঠতে পারেন নির্ণায়ক শক্তি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আয়েশা তোফায়েল। একজন নাগরিক হিসেবে আগামী নির্বাচন তাকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। তিনি বলেন, 'ভোট দেওয়াকে বলা হয় নাগরিক দায়িত্ব। কিন্তু আমার মতো তরুণদের কাছে ভোট দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্তটি আশা এবং বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে।'

আয়েশা বলেন, 'আমি ভোট দিতে চাই কারণ দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অংশ নেওয়ার এটি একটি প্রত্যক্ষ উপায়। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষার মান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চিন্তিত। ভোট দেওয়ার মাধ্যমে আমি অনুভব করি যে আমার মতামতেরও গুরুত্ব আছে।'

আয়েশার এই কথা এখন দেশের কোটি কোটি তরুণ ভোটারের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণরা ভোট দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

আগামী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি 'জুলাই সনদ'–এর ওপর গণভোট হবে। গণভোটের ফলাফলেও তরুণদের ইচ্ছার বড় প্রভাব ফেলবে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেশে মোট ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৩ জন। ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জনে। অর্থাৎ গত ১৭ বছরে ভোটার বেড়েছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৮ হাজার ১৮০ জন। এবার নারী ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি নাগাদ দেশে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা হবে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৬, যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। জাতীয় যুব নীতি ২০১৭ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের 'যুব' বা তরুণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলিম বলেন, 'ভোটারদের এই বিশাল অংশটিই ফলাফল নির্ধারণের প্রধান ফ্যাক্টর। বাংলাদেশে যখনই দুটি দলের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়, তখন দেখা যায় অল্প কিছু ভোটের ব্যবধানে প্রার্থী জয়ী হন। তরুণ ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যেদিকে ঝুঁকবে, সেই প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা তত বেড়ে যাবে।'

বদিউল আলম মজুমদার ও আব্দুল আলিম দুজনই মনে করেন, গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে অনেক নতুন ভোটার ভোট দিতে পারেননি। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, 'অনেকে চেষ্টা করেও ভোট দিতে পারেননি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারাই হবেন নির্ণায়ক শক্তি। আর গণভোটের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা হবে আরও গুরুত্বপূর্ণ।'

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ–অভ্যুত্থান এবং আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, 'তরুণ ভোটারদের অধিকাংশই কেবল দর্শক ছিলেন না। তাদের অনেকেই বন্ধু-স্বজনদের জীবন দিতে বা আহত হতে দেখেছেন। তাই বিষয়টি তাদের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তারা নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। তাদের তিনটি অগ্রাধিকার—নির্বাচন, সংস্কার ও ন্যায়বিচার।'

ভোটের অপেক্ষায় তরুণরা

তরুণদের এই আগ্রহ বিভিন্ন জরিপেও উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের (বিওয়াইএলসি) 'ইয়ুথ ম্যাটারস সার্ভে ২০২৫'-এ দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ২ হাজার ৫৪৫ জন উত্তরদাতার ৯৭ শতাংশই ভোট দিতে চান। আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকার সম্পর্কে জানতে চাইলে ৬৭ শতাংশ দুর্নীতি নির্মূল, ৫৬ শতাংশ বেকারত্ব দূরীকরণ, ২৪ শতাংশ নিরাপত্তা এবং ১৪ শতাংশ গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার কথা বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, ৮৯ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে আগ্রহী। ৪ হাজার ৯৮৫ জনের মধ্যে পরিচালিত জরিপে ৬৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন অতীতের নির্বাচনগুলোয় কারচুপি হয়েছে, তবু ৮০ শতাংশ আশাবাদী যে আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।

আব্দুল আলিম বলেন, 'আগে ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ তরুণদের মধ্যে জেদ তৈরি করেছে। তারা ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে আছেন এবং এবার তারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন।'

তরুণদের স্মৃতিতে গত তিনটি নির্বাচনের ক্ষত এখনো দগদগে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি ও সমমনা দলগুলো বর্জন করে। ফলে ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং ভোট পড়ে মাত্র ৪০ দশমিক ০৪ শতাংশ।

২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দল অংশ নিলেও ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরার অভিযোগ ওঠে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় ৫০টি আসনের মধ্যে ৩৩টিতেই এমন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিরোধী দলগুলো দাবি করে, নির্বাচন শুরু হওয়ার আগের রাতেই ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট দেওয়া হয়েছিল। ওই নির্বাচনে ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছিল বলে জানায় নির্বাচন কমিশন।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট পড়ে ৪১ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিরোধী দলগুলো বর্জন করায় আওয়ামী লীগ নিজেদের 'ডামি প্রার্থী' দাঁড় করিয়ে প্রতিযোগিতার আবহ তৈরির চেষ্টা করে।

এসব নির্বাচনে অনেক তরুণ ভোটার ভোট দিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন।

আদনান আহমেদ নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী ২০১৮ সালে প্রথম ভোটার হন। তিনি তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ভেরিফিকেশনের পর তাকে একটি ভোটার সিরিয়াল নম্বর দেওয়া হয়, যার নিচে লেখা ছিল 'নৌকায় ভোট দিন'।

আদনান বলেন, 'ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখি তথাকথিত গোপন কক্ষ বলতে কিছু নেই। বুথটি পুরোপুরি খোলা এবং ছাত্রলীগের কয়েকজন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা সবাইকে দেখছিল এবং নৌকায় সিল মারতে বাধ্য করছিল। ভয়ে অনেকেই তা মেনে নিচ্ছিল।'

আদনান এর প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন, 'আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কারা? এটা তো গোপন কক্ষ হওয়ার কথা, চারপাশে পর্দা থাকার কথা। আপনারা কেন আমাদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছেন?'

এ নিয়ে তর্কাতর্কি শুরু হলে ওই ব্যক্তিরা তাকে মারতে উদ্যত হয়। পরে পোলিং অফিসারের দায়িত্বে থাকা তার বাবার এক সহকর্মীর হস্তক্ষেপে তিনি রক্ষা পান। সেই অভিজ্ঞতায় হতাশ হয়ে আদনান ২০২৪ সালের নির্বাচনে আর ভোট দিতে যাননি।

উল্লেখ্য, এই তিনটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছিল।