'পাখি শিকারি' হিসেবে একসময় পরিচিতি ছিল রফিক মিয়ার। কিন্তু এখন তিনি আর পাখি শিকার করেন না। উল্টো অন্যদের শিকার থেকে বিরত রাখতে কাজ করেন। তার এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একদল তরুণের প্রচেষ্টা। 'শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটি' (এসবিসিএস) নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির সহায়তায় রফিক এখন হাঁস পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। শুধু রফিক নন, সাবেক শিকারিদের অনেকেই এখন পাখি সুরক্ষার কাজে যুক্ত হয়েছেন।
২০১৮ সালে মাত্র পাঁচজন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এসবিসিএস। লক্ষ্য ছিল, পাহাড়ঘেরা শেরপুরকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলা। আজ আট বছর পর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। বর্তমানে ৬০ জন স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে গঠিত এই সংগঠনটির প্রচেষ্টায় শেরপুরে পাখি শিকার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। হাজার হাজার পাখি এখন নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে।
সংগঠনটির সভাপতি সুজয় মালাকার জয় বলেন, 'এখনো কিছু মানুষ গোপনে পরিযায়ী পাখি শিকারের চেষ্টা করে। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তা বন্ধ করতে। গত আট বছরে বন বিভাগের সহায়তায় আমরা দুই হাজারের বেশি পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করেছি।' তিনি জানান, চিল, পেঁচা, বাজপাখি, টিল, শকুন, ডাহুক ও ইন্ডিয়ান স্পটেড ঈগলের মতো আহত পাখিদের সেবা দিয়ে সুস্থ করে বনাঞ্চলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এসবিসিএসের সদস্যদের ভাষ্য, তাদের তৎপরতায় প্রায় ৯০ শতাংশ পাখি শিকার বন্ধ হয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শেরপুরকে পাখিদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ঘোষণা করার আশা করছেন তারা।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. শহিদুজ্জামান জানান, গত আট বছরে শেরপুরে প্রায় ৩৬১ প্রজাতির পাখি শনাক্ত করা হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চল, ঝিনাইগাতীর বগাডুবি, গজনী, রাঙটিয়া, নকলা উপজেলার কুর্চা এবং নালিতাবাড়ীর মধুটিলায় এখন পাখির কলকাকলি মুখর থাকে। শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিপুলসংখ্যক পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে এসব এলাকায়।
কলেজশিক্ষক ও সংগঠনের আরেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. আবদুল কাদের বলেন, করোনা মহামারির সময় মানুষ ঘরবন্দী থাকায় প্রকৃতি তার আপন রূপ ফিরে পায়, পাখির সংখ্যাও বাড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা এখন বন্য পাখির প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল।
সংগঠনটির কাজের স্বীকৃতিও মিলেছে জাতীয় পর্যায়ে। 'ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন অ্যাওয়ার্ড-২০২৫' এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ড ফেয়ারে 'স্পেশাল অনারারি অ্যাওয়ার্ড ফর বার্ড কনজারভেশন' লাভ করেছে এসবিসিএস।