চট্টগ্রাম নগরীর হিলভিউ এলাকা থেকে আটক দুই শিশুর কারাদণ্ডের পর পুলিশের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছে।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ নথিতে বয়স বাড়িয়ে উল্লেখ করে তাদের আদালতে উপস্থাপন করেছে। প্রকৃত বয়স জানানোর পরও জন্ম সনদ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদ যাচাই করতে চায়নি। ফলে তারা শিশু হিসেবে প্রাপ্য আইনি সুরক্ষাবঞ্চিত হয়েছে।
গত ৯ জানুয়ারি রাতে হিলভিউ এক নম্বর সড়ক থেকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার একটি টহল দল দুই শিশুকে আটক করে।
তারা হলো—মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও মো. সাদমান হোসেন। তাদের একজনের কাছে ইলেকট্রিক টেজার গান পাওয়া যায়। আটকের পর এ সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত করেছেন বায়েজিদ বোস্তামী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম। তিনি উল্লেখ করেছেন, দুজনের বয়স ১৮ বছর।
পর দিন তাদের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা সাত্তারের আদালতে উপস্থাপন করা হলে বিচারক তাদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেন।
আরিফুর রহমান বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার মোহাম্মাদীয়া হাফেজুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার এসএসসি (দাখিল) পরীক্ষার্থী, সাদমান হোসেন ওই মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র। জন্ম সনদ অনুযায়ী, আরিফুরের বয়স ১৫ বছর দুই মাস ও সাদমানের বয়স ১৭ বছর তিন মাস।
গতকাল এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে দণ্ড স্থগিত রেখে তাদের প্রবেশনে মুক্তির আবেদন করেন শিশু দুটির আইনজীবী সৌরভ চৌধুরী। তবে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মহিদুল ইসলাম আবেদনটি নাকচ করে দেন।
সৌরভ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'তারা দুজনই শিশু। পুলিশ তাদের বয়স বেশি দেখিয়েছে, ভবঘুরে সাজিয়ে আদালতে উপস্থাপন করেছে। তাদের বয়সের প্রমাণপত্র হিসেবে জন্ম সনদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নথি উপস্থাপন করে আপিলের শর্তে রোববার আমরা আদালতে জামিন চেয়েছিলাম। আদালত সেটি মঞ্জুর করেননি। গতকাল আমরা প্রবেশনে থাকার শর্তে মুক্তির আবেদন করলে আদালতে সেটিও নাকচ করে দেন।'
'নিয়ম অনুসারে, শিশুদের বিচার হবে শিশু আদালতে। কিন্তু এখানে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে তারা কারাগারে গেছে। কারাগারে অন্য দাগি আসামিদের সঙ্গে তারা তিন দিন অবস্থান করছে, যা আইনের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক,' বলেন তিনি।
বয়স জটিলতার ব্যাপারে জানতে চাইলে বায়েজিদ বোস্তামী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সন্দেহজনক আচরণের কারণে তাদের তল্লাশি করে একজনের কাছ থেকে একটি ইলেকট্রিক শক মেশিন (টেজার গান) পাওয়া যায়। থানায় আনার পর তারা তাদের বয়স ১৮ জানিয়েছিল।'
'পরিবারের সদস্যদের বয়স সংক্রান্ত প্রমাণ দিতে বলেছিলাম, কিন্তু পরিবার সেদিন কোনো নথিপত্র দেয়নি,' দাবি করে এই পুলিশ কর্মকর্তা।
তিনি আরও বলেন, 'পুলিশের এখানে কোনো গাফিলতি নেই। তারা আমাদের যে বয়স বলেছে, আমরা সেটিই লিখেছি।'
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আরিফুরের মা ইয়াসমিন আকতার। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা পুলিশকে বলেছি আমার ছেলের বয়স ১৬ বছর, সে এবার দাখিল পরীক্ষার্থী। পুলিশ সেটি আমলে নেয়নি। তারা ১৮ বছর লিখে আদালতে পাঠিয়েছে।'
'আমার ছেলেকে আটকের পর সে তার বয়স ১৭ বছর বলেছে। সে মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেছে, এখন মুদি দোকানে চাকরি করে। তারা দুজন বন্ধু। আমরা পুলিশকে সব খুলে বলেছিলাম,' বলেন সাদমানের বাবা মো. এমরান হোসেন।
এ ব্যাপারে জানতে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল ইসলামকে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া আহসান হাবীব ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আইনের বিধান হলো, বয়স দ্বারা শিশু নিশ্চিত হলে তাদের শিশু আদালতেই উপস্থাপন করতে হবে। কোনো ক্রমেই ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার করা যাবে না। শিশু হলে তাদের সংশোধন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে, সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে কারাগারে রাখার কোনো অবকাশ নেই।'
তিনি বলেন, 'এখানে পুলিশের দায় বেশি। তারা শুরুতেই বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে। যাতে করে তারা শিশু আইনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।'