Thursday, Jan 15, 2026 28°C

Concise and comprehensive global coverage.

General

মিঠিপুরে বিলুপ্তির পথে আখ মাড়াইয়ের এক ঐতিহ্য

একটা সময় শীত মানেই ছিল মৌলভীবাজারের মিঠিপুর গ্রামে আখ মাড়াইয়ের উৎসব। মহিষে টানা কাঠের কলে আখ পিষে বের হতো রস, পুরুষেরা ব্যস্ত থাকতেন মাড়াইয়ে আর নারীরা বড় মাটির হাঁড়িতে সেই রস জ্বাল দিতেন গুড় আর লালি বানাতে।বাতাসে ভেসে বেড়াতো গুড়ের মিষ্টি গন্ধ। কিশোর-কিশোরীরা দল বেঁধে ভিড় করত উষ্ণ, লালচে আখের রস পান করতে।কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিকতার চাপে সেই দৃশ্যগুলো আজ অনেকটাই ম্লান। মহিষচালিত কলের জায়গা নিয়েছে ডিজেলচালিত মেশিন। আর নেই সেই প্রাণবন্ত সকালের জমায়েত। হারিয়ে গেছে শীতকে ঘিরে গড়ে ওঠা...

NP
Published: January 13, 2026, 03:44 PM
মিঠিপুরে বিলুপ্তির পথে আখ মাড়াইয়ের এক ঐতিহ্য

একটা সময় শীত মানেই ছিল মৌলভীবাজারের মিঠিপুর গ্রামে আখ মাড়াইয়ের উৎসব। মহিষে টানা কাঠের কলে আখ পিষে বের হতো রস, পুরুষেরা ব্যস্ত থাকতেন মাড়াইয়ে আর নারীরা বড় মাটির হাঁড়িতে সেই রস জ্বাল দিতেন গুড় আর লালি বানাতে।

বাতাসে ভেসে বেড়াতো গুড়ের মিষ্টি গন্ধ। কিশোর-কিশোরীরা দল বেঁধে ভিড় করত উষ্ণ, লালচে আখের রস পান করতে।

কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিকতার চাপে সেই দৃশ্যগুলো আজ অনেকটাই ম্লান। মহিষচালিত কলের জায়গা নিয়েছে ডিজেলচালিত মেশিন। আর নেই সেই প্রাণবন্ত সকালের জমায়েত। হারিয়ে গেছে শীতকে ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক আনন্দ।

তবুও শীতকালীন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ—এই আখ মাড়াইয়ের ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে কিছু বিচ্ছিন্ন গ্রামে।

নৌকায় মনু নদী পেরিয়ে, গ্রামীণ পথ ধরে হাঁটলেই পৌঁছানো যায় রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের মিঠিপুর গ্রামে। যেখানে আজও আখ মাড়াই চলছে, অবশ্য সীমিত পরিসরে।

ভোরের আগে কৃষকরা মাঠে নেমে আখ কাটেন। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এলাকাটি প্রাণ ফিরে পায়। কেউ তাজা রস বিক্রি করেন, কেউ আবার সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় ও তরল লালি তৈরি করেন।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় মিঠিপুরে শতাধিক পরিবার আখ চাষে যুক্ত ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে পাঁচ থেকে সাতটিতে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং আধুনিক সুবিধার অভাবে অনেকেই এই লাভজনক ফসল থেকে সরে গেছেন।

তবে মনু নদীর তীরবর্তী কিছু এলাকায় নতুন করে আখ চাষের প্রতি স্থানীয়দের আগ্রহ বাড়ছে বলে জানান কৃষকরা।

প্রায় ৩৫ বছর ধরে এখানে আখ চাষ করে আসছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব কৃষক সিরাজুল ইসলাম গেন্ডু। বলেন, 'বাবার পর আমি এই কাজ ধরেছি। যতদিন বেঁচে থাকব, পূর্বপুরুষের এই পেশা ছাড়বো না।'

সিরাজুল জানান, আখের রসের মিষ্টতা থেকেই মিঠিপুর নামের উৎপত্তি।

এ মৌসুমে সাড়ে তিন কিয়ার (১০৫ শতাংশ) জমিতে আখ চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে তিনি এক লাখ টাকা আয় করেছেন এবং মৌসুম শেষে আরও দেড় লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন।

গত দুই দশক ধরে তিনি মহিষের বদলে মেশিনে আখ মাড়াই করছেন এবং অন্য কৃষকদের ভাড়ার বিনিময়ে এই সেবা দিচ্ছেন।

ডিসেম্বরের শুরুর সময়টা আখ মাড়াইয়ের মৌসুম। কৃষকদের দিন শুরু হয় ভোরে। পাইকাররা সকালেই এসে রস কিনে নিয়ে যান। উদ্বৃত্ত রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় গুড় ও লালি, যা পরে বাজারে পাঠানো হয় বা সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়।

বর্তমানে আখের রস প্রতি লিটার ৬০ টাকা, গুড় প্রতি কেজি ২৫০ টাকা এবং লালি ২২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই পেশায় যুক্ত জহিরুল ইসলামের বাড়ির উঠোনেও ভোরের নীরবতা ভাঙে মাড়াইয়ের যান্ত্রিক ছন্দে। মেশিনের এক পাশে ঢুকে পড়া সবুজ আখের ডালপালা অন্য পাশে বেরিয়ে আসে ফ্যাকাশে খোসা হয়ে। নিচে টুপটাপ ঝরে পড়ে তাজা রস, যা মেপে টিনের ক্যানভর্তি করা হয় পাইকারদের জন্য।

দ্য ডেইলি স্টারকে জহিরুল বলেন, 'ডিসেম্বরে প্রতিদিন ভোরে কাজ শুরু করি। আগে আখ মাড়াই, তারপর বাকি কাজ।'

আখ চাষে প্রচুর পরিশ্রম ও শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কৃষক সহজ ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। তবুও আখ মিঠিপুরের পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একসময় চারদিকে আখই ছিল। সেই স্মৃতির ধারাবাহিকতায় আজও কিছু কৃষক এই ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে আছেন।

এলাকার প্রবীণ শিক্ষক আব্দুল আজিজ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আজও শীতের সকালে মিঠিপুরে আখের রস, গুড়ের পিঠা আর মিষ্টি খিচুড়ির গন্ধ ভেসে আসে।'

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, জেলায় আখ চাষ সীমিত হলেও সম্ভাবনাময়। সমতল এলাকায় আখ চাষ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে কৃষকদের উপকরণ ও সহায়তা দেওয়া হবে।