নজিরবিহীন ত্যাগের বিনিময়ে কর্তৃত্ববাদী চোরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের যে অভীষ্ট লক্ষ্য সূচিত হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত বিভিন্ন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম 'সংস্কার-বিমুখতা' ও 'আমলাতান্ত্রিক আধিপত্যের' প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ফলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
এ ছাড়া, মুষ্টিমেয় উদাহরণ ছাড়া একতরফাভাবে অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে।
আজ সোমবার 'অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা' শীর্ষক পর্যালোচনা প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
সংবাদ সম্মেলনে পর্যালোচনাটি উপস্থাপন করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
এ ছাড়া, উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী ব্যবস্থাপনার উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের ও টিআইবির রিসার্চ অ্যান্ড পলিসির পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান।
টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে সরকারের গৃহীত অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের ওপর সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১১টি সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, একাধিক শ্বেতপত্র কমিটি, বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিটি এবং গুমসংক্রান্ত 'কমিশন অব এনকোয়ারি' গঠনের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে কর্তৃত্ববাদী সরকার কর্তৃক পরিচালিত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের জন্য জাতিসংঘকে আহ্বান জানানোর মতো ইতিবাচক উদ্যোগ দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, সরকার সার্বিকভাবে সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের সূচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংস্কারের প্রশ্নে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী মহলের অপশক্তির কাছে সরকারের নতি স্বীকার করেছে উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার-প্রতিরোধক মহলকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'এই অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল এবং সংস্কার-পরিপন্থী অনেক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, এমনকি জুলাই সনদকে যুক্তিহীনভাবে লঙ্ঘন করে এমন নেতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা পরবর্তী সরকারেরও অনুসরণ করার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের একাংশের অন্তর্ঘাতমূলক অপশক্তির কাছে সরকারের নতি স্বীকারের ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।'
দুদক সংস্কার কমিশন প্রণীত সুপারিশমালাকে সরকার বা দুদক প্রত্যাশিত গুরুত্ব দেয়নি উল্লেখ করে ড. জামান বলেন, 'দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ—একটি স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি সৃষ্টির বিধান—উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও এ ক্ষেত্রে দুদকের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের যেমন কোনো দ্বিমত ছিল না, তেমনি জুলাই সনদ অনুযায়ী প্রায় সব রাজনৈতিক দলেরও নোট অব ডিসেন্ট বিহীন সম্মতি ছিল। এটা সরকার বা দুদক—কারোরই অজানা ছিল না।'
তিনি বলেন, 'দুদকের অধিকতর সক্রিয়তার ফলে আমলাতান্ত্রিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতি নিয়ন্ত্রিত হবে, এটা যারা চান না তারাই মূলত এই সংস্কারটির বিরোধিতা করেছেন। তাই দুদকের ও সরকারের আমলাতান্ত্রিক শক্তির একাংশের কাছে উপদেষ্টা পরিষদ, তথা অন্তর্বর্তী সরকার আত্মসমর্পণ করেছে এমন মনে হওয়া অমূলক নয়।'
'অন্যদিকে অধ্যাদেশে দুর্নীতি অ-আমলযোগ্য অপরাধ উল্লিখিত হলেও একই অনুচ্ছেদে স্ববিরোধী ধারা অন্তর্ভুক্ত করে দায় স্বীকারের নামে আপোষের সুযোগ দিয়ে দুর্নীতি সুরক্ষার ''ফ্লাড-গেইট'' উন্মুক্ত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে,' যোগ করেন তিনি।
পর্যালোচনায় ড. জামান বলেন, 'পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ প্রণয়নের মাধ্যমে একটি জনকল্যাণমুখী বাহিনী গঠনের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত স্বপ্নকে সম্পূর্ণভাবে ধূলিসাৎ করা হয়েছে। অধ্যাদেশে "স্বাধীন ও নিরপেক্ষ" শব্দগুলো পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়নি।'
তিনি বলেন, 'বাছাই কমিটিতে নাগরিক প্রতিনিধির বদলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান এবং সরকার কর্তৃক প্রজাতন্ত্রে কর্মরত ব্যক্তি বা সরকারি কর্মচারীকে নিয়োগের এখতিয়ার প্রদান মূলত পুলিশ কমিশনকে ক্ষমতাসীন সরকার ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ ও প্রশাসনিক আমলাদের ক্ষমতার অব্যাহত অপব্যবহারের রিসোর্টে পরিণত করার সুযোগ করে দিয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'একইভাবে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট আটককেন্দ্র কমিশনের কার্যক্রমের আওতাভুক্ত করা একটি মাইলফলক হলেও, শেষ পর্যায়ে অংশীজনদের অন্ধকারে রেখে বাছাই কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্তির বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে।'
'কমিশনের ওপর সরকারি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় একটিমাত্র ধারাই যথেষ্ট। তদুপরি, ব্যাপকভাবে সরকারি কর্মচারীকে প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা কমিশনের স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করবে,' যোগ করেন তিনি।
পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার জন্য জরুরি কৌশলগত সুপারিশগুলো সরকার বা দুদকের কাছে প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি। বিশেষ করে, বাছাই কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি মনোনয়নের এখতিয়ার স্পিকারের হাতে ন্যস্ত করা, বাংলাদেশি নাগরিককে বাছাই এখতিয়ার বিচারপতির বদলে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা এবং কমিশনার নিয়োগে অভিজ্ঞতার শর্ত বাড়িয়ে ২০ বছর করা মূলত সুনির্দিষ্ট কোনো মহলের স্বার্থ রক্ষার ইঙ্গিত।
এতে বলা হয়, শর্টলিস্ট করা প্রার্থীদের নাম প্রকাশের বিধান বাদ দেওয়া ও দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি মোকাবিলায় স্বতন্ত্র ইন্টিগ্রিটি ইউনিট নিশ্চিতের মতো কৌশলগত সুপারিশগুলো প্রতিফলিত না হওয়া দুদকের জবাবদিহিতা ও জন-আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।
এ ছাড়া, বেসরকারি খাতের দুর্নীতিকে আইনের আওতামুক্ত রাখা এবং অপরাধ স্বীকার করলে সাজা মার্জনার ঢালাও সুযোগ রাখা দুর্নীতিবিরোধী চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
উপস্থাপনায় আরও বলা হয়, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশে রাজস্ব নিরূপণ ও আদায় নিরীক্ষার সুযোগ না রাখা, আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি, মহা হিসাব নিরীক্ষকের প্রতিবেদন ও বিধি প্রণয়নে সরকারের পরামর্শ নেওয়া ও পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা এবং রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ প্রণয়নে অদূরদর্শিতার ফলে আর্থিক জবাবদিহিতা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এনবিআরকে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে স্বতন্ত্র এজেন্সি হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ হারানোকে সরকারের প্রস্তুতির অভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছে টিআইবি।
এতে বলা হয়, সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশগুলোতে অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধকরণ বা উপাত্ত ব্যবস্থাপনার মতো যুগোপযোগী ইতিবাচক বিধান থাকলেও, সামষ্টিকভাবে বিচারিক সুরক্ষা ছাড়াই নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যে রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে বাধাহীন প্রবেশের সুযোগ রাখা হয়েছে। এটি মূলত সুরক্ষার নামে নজরদারিভিত্তিক শাসনব্যবস্থা চলমান রাখারই আইনি ব্যবস্থা।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি উল্লেখ করে, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, নারীবিষয়ক, শ্রম ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর শ্বেতপত্রের সুপারিশ নিয়ে বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। সংস্কারের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্ধারণে কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই শিক্ষা ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে।