আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করার পরও দলের নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে এখনো নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় আছেন, যা দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে মাত্র চারজন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন, আবেদন করেছেন।
তবে শীর্ষ নেতারা আশা করছেন আগামী কয়েক দিনে আরও বিদ্রোহী প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে মনোনীতদের সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেবেন।
বিপুল সংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী এরইমধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সূত্রপাত করেছেন। এতে অস্বস্তিতে পড়েছেন দলের নির্বাচনী অংশীদাররা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, যে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অব্যাহত অবাধ্যতা বিএনপির প্রার্থীদের অবস্থান দুর্বল করে দিতে পারে।
এর ফলে বিরোধী প্রার্থীদের জন্য বেশ কয়েকটি আসনে জয়ের দরজা খুলে যেতে পারে যেখানে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রত্যাশিত।
তফসিল অনুযায়ী, ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত তারিখ। দলীয় নেতারা বলেছেন, তারা আশা করেন, এই সময়ে বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন এবং সরে দাঁড়াবেন।
বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলীয় নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগে বিএনপি এরইমধ্যে ১০ জন দলীয় নেতাকে বহিষ্কার করেছে।
ঢাকার বাইরে ৬৩টি জেলায় জমা দেওয়া মনোনয়নপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১১৮টি আসনে প্রায় ১৭৯ জন বিএনপি নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের জন্য আসনটি ছেড়ে দিয়েছে।
ঢাকা উত্তর মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবকে দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
সাইফুল হক বলেন, তিনি আশা করছেন আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে বিএনপি থেকে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনেও বিএনপি তাদের নিজস্ব প্রার্থী ঘোষণা করেনি, কারণ আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের একজন প্রার্থীকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিযোগে বহিষ্কৃত বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা অবশ্য ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যাবেন।
পটুয়াখালী-৩ আসন গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপি নেতা হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জন্যও বরাদ্দ থাকলেও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
ভোলা-১ আসন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থের জন্য ছেড়ে দিলেও বিএনপি নেতা গোলাম নবী আলমগীর সেখানে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
নাটোর-১, ঝালকাঠি-১ ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনে চারজন বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ
গত ৯ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ-৫ আসনের বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরী দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর নির্বাচন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে মিজানুর লেখেন, 'আমার শ্রদ্ধেয় অভিভাবক বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাহেব আমাকে গতকাল তার গুলশান কার্যালয়ে ডেকে দল ও দেশের স্বার্থে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেছেন।'
সাবেক সংসদ সদস্য এবং সুনামগঞ্জ বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ দলীয় মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নোয়াখালী-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চাওয়া বিএনপি নেত্রী হাসনা জসীমউদ্দিন মওদুদ ৫ জানুয়ারি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
৬ জানুয়ারি এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, 'দলের চেয়ারম্যান ও নতুন নেতৃত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বিএনপি নেতা আব্দুল খালেক নির্বাচন থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ৬ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকার গুলশানে নিজ কার্যালয়ে এক বৈঠকে চেয়ারম্যান তাকে মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন।
১০ জানুয়ারি বাঞ্ছারামপুরের তেজখালী ইউনিয়নে এক দলীয় সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে খালেক প্রকাশ্যে তার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, 'দলের চেয়ারম্যান আমাকে ফোন করেছেন। জোনায়েদ সাকিকে দল মনোনীত করেছে। দলের প্রধান যদি বলে, সেখানে আমি কেমনে না করতে পারি বলেন?'
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে বিএনপি নিজস্ব প্রার্থী দেয়নি। আসনটি তাদের শরিক গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকির জন্য ছেড়ে দিয়েছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামান ৮ জানুয়ারি ঘোষণা দেন, তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন এবং বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থনে কাজ করবেন।
দলীয় সূত্র জানায়, একরামুজ্জামান একই দিনে গুলশান কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন, যেখানে তাকে দলের নির্বাচনী কৌশল অনুসারে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মুর্শিদা খাতুন তার মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেন। মুর্শিদা বিএনপির সিনিয়র নেতা শহীদুজ্জামান বেল্টুর স্ত্রী। একই আসনে সম্প্রতি বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খান দলীয় সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে আরও বহিষ্কার করা হবে।