সিলেট বিভাগের হাওর অঞ্চলজুড়ে ঘন কুয়াশা ও দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহে বোরো বীজতলায় ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষিবিদরা। রোপণ মৌসুমের আগে চারা ঘাটতিতে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষকরা।
কৃষকরা জানিয়েছেন, প্রায় ২৫ দিন ধরে অব্যাহত ঘন কুয়াশা ও মেঘলা আবহাওয়ায় সূর্যালোকের অভাবে বেশ কয়েকটি এলাকার বোরো বীজতলা হলুদ রঙ ধারণ করেছে।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ডিসেম্বরের শেষের দিকে তাপমাত্রা তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং তারপর থেকে বেশিরভাগ দিন কুয়াশাচ্ছন্ন ও মেঘলা আবহাওয়া বিরাজ করছে।'
'গত ২০ দিন ধরে তাপমাত্রা ৮ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ছিল,' বলেন তিনি।
হাকালুকি হাওরের মীরশংকর এলাকার কৃষক একরামুল হক ৪ বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপণের জন্য বীজতলা প্রস্তুত করেছিলেন। তবে কয়েক দিনের তীব্র ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশার কারণে বীজগুলি সঠিকভাবে অঙ্কুরিত হতে পারেনি। এমনকি গজানো চারাগুলোও ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে।
দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, 'বীজতলায় পানি পরিবর্তন করে বিভিন্ন উপায়ে ঢেকে দেওয়ার পরেও, আমি এখনও নিশ্চিত নই যে চারাগুলো রোপণের জন্য উপযুক্ত হবে কি না।'
গত বছরের তুলনায় বেশি দামে বীজ কিনে বীজতলা প্রস্তুত করেন কাওয়াদিঘি হাওরের কৃষক বাশের আলী। তবে, অঙ্কুরোদগমের সময় তীব্র ঠান্ডার কারণে বেশিরভাগ চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, 'আমার আশঙ্কা, এতে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।'
কাওয়াদিঘি হাওরের আরেক কৃষক সুবহান মিয়ার বীজতলা কিছুদিন আগেও সুস্থ ও সবুজ ছিল। এখন ক্রমাগত ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে চারাগুলো লালচে-হলুদ হতে শুরু করেছে।
জুড়ি এলাকার কৃষক মনির উদ্দিন ৭ বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপণ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। তার বীজতলায় চারার বৃদ্ধি ধীর হয়ে গেছে। অনেকগুলো হলুদ হতে শুরু করেছে। এতে সম্ভাব্য ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকি হাওর এলাকার ভূকমইল গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে তার ৩৫ শতাংশ বীজতলায় দুই সপ্তাহ বয়সী চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করে এলাকার আরেক কৃষক মোসাব্বির আলী (৫৫) জানান, তার ২০ শতাংশ জমিতে চারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এ বছর বোরো ধান চাষ করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বড়লেখা উপজেলার তেতলী এলাকার কৃষক সুন্দর মিয়া (৪৫) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'যদি আরও কয়েকদিন ঠান্ডা ও কুয়াশা অব্যাহত থাকে, তাহলে জানুয়ারিতে রোপণের সময় আমরা তীব্র চারা সংকটের মুখোমুখি হতে পারি।'
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকি হাওরের পাশে জবদা গ্রামের শামীম মিয়া বলেন, 'গত ২৩ দিনের ঠান্ডা আবহাওয়ায় আমাদের রবি ফসলের বীজতলায় পাতা মোড়ানো ছত্রাক বা চারা পুড়ে যেতে দেখেছি। কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমরা কীটনাশক প্রয়োগ করছি।'
কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের ছাইকুট গ্রামের আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, 'প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। আমার এলাকার প্রায় ২ একর জমির রবি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আমি উদ্বিগ্ন।'
কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন জানান, মৌলভীবাজারের কিছু অংশের বীজতলায় ক্ষতি হয়েছে তবে আবহাওয়ার উন্নতি হলে অবস্থার উন্নতি হতে পারে।
দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, 'আমরা কৃষকদের রাতে বীজতলায় সেচ দেওয়ার, পলিথিন শিট দিয়ে ঢেকে রাখা ও ঠান্ডার চাপ কমাতে যথাযথ সার প্রয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছি। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, 'সরকার সিলেট বিভাগের মোট ২৩ হাজার ৪৩৭ হেক্টরের মধ্যে হাওর অঞ্চলে ১২ হাজার ৮৮৯ হেক্টর বোরো বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ করা হয়নি, তবে দীর্ঘ কুয়াশা বীজতলাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।'
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক কাজী লুৎফুল বারী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঘন কুয়াশা তরুণ উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর। আরও কয়েক দিন কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলে বোরো বীজতলা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। দীর্ঘায়িত ঠান্ডা তাপমাত্রা এবং ঘন কুয়াশা কৃষির জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।'